বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ফিকি

করের আওতা সম্প্রসারণ, ডিজিটাল রাজস্ব প্রশাসন ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের তাগিদ

করের আওতা সম্প্রসারণ ও রাজস্ব প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর এবং প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিতের তাগিদ জানিয়েছে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি)।

সংস্থাটি বলছে, বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়ে ফিকি বলেছে, টেকসই রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কাঠামোগত সংস্কার, নীতিগত পূর্বানুমেয়তা ও আরো প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে দেশীয় ও বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে করের আওতা সম্প্রসারণ, ব্যবসার ব্যয় হ্রাস, রাজস্ব প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন ত্বরান্বিত করা ও সব খাতের জন্য সমতাভিত্তিক ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে ফিকি।

গতকাল রাজধানীর গুলশানে নিজ কার্যালয়ে বাজেট-পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী। অনুষ্ঠানে চেম্বারের বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন ফিকির ট্যাক্স কনসালট্যান্ট স্নেহাশীষ বড়ুয়া।

ফিকি সভাপতি বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটটি একটি ইতিবাচক ও তুলনামূলকভাবে পূর্বানুমানযোগ্য বাজেট। বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা খাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধিকে আমরা স্বাগত জানাই। এসব কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে দেশের প্রান্তিক মানুষের জীবনমানের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ বর্তমানে অনেকাংশে রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতি হলেও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে শিক্ষা ও স্কিল ডেভেলপমেন্টে আরো জোর দেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারে সরকারের আরো মনোযোগী হতে হবে।’

গ্রিন ইনিশিয়েটিভ ও সৌরবিদ্যুৎ খাতে প্রদত্ত প্রণোদনাকে স্বাগত জানিয়ে রূপালী হক চৌধুরী বলেন, ‘এসব উদ্যোগ দেশের জ্বালানি খাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামার প্রভাব অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ খাতের ওপর তুলনামূলকভাবে কম পড়বে।’ তিনি এটিকে একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন, যা টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে।

ফিকি সভাপতি আরো বলেন, ‘বর্তমানে মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে এবং বিদ্যমান প্রায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।’ তবে এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারের সুস্পষ্ট কৌশল ও রোডম্যাপ তুলে ধরা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে রূপালী হক বলেন, ‘বাজেটে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে এবং অতীতে এ ঘাটতি পূরণে পরোক্ষ কর ও সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। এতে নিয়মিত করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন খাতে কার্যকর করহার প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশি হয়ে যায়।’

তিনি কর ব্যবস্থাকে আরো ভারসাম্যপূর্ণ ও বিনিয়োগবান্ধব করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধানের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা ইতিবাচক। তবে এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতিগত দিকনির্দেশনা ও বাস্তবায়ন কৌশল থাকা প্রয়োজন। করের আওতা সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।’ এ লক্ষ্যে নন-ফাইলারদের কর ব্যবস্থার আওতায় আনা, বিভিন্ন লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রদান এবং নবায়নের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক করা, ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রেও পিএসআর চালু করা ও সরবরাহকারীদের কর রিটার্নের তথ্যের সঙ্গে উৎসে কর কর্তন-সংক্রান্ত তথ্যের ৩৬০ ডিগ্রি যাচাই ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করে ফিকি।

অনুষ্ঠানে বিনিয়োগ আকর্ষণ ও ধরে রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশের কার্যকর করহার যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য একটি রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানিয়ে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির জন্য নগদবিহীন লেনদেনভিত্তিক কর সুবিধা পুনর্বহাল, আগামী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়া, বিক্রয়ভিত্তিক ন্যূনতম কর কমানো, অগ্রহণযোগ্য ব্যয়ের তালিকা পুনর্বিবেচনা এবং মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে ব্যক্তিগত আয়কর কাঠামো পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়। বাণিজ্য প্রতিযোগিতা বাড়াতে কাস্টমস ব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরে ফিকি। এক্ষেত্রে প্রকৃত লেনদেনমূল্য বা আন্তর্জাতিক রেফারেন্স মূল্যের ভিত্তিতে শুল্ক নির্ধারণ, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস, মূলধনি যন্ত্রপাতির দ্রুত কাস্টমস ছাড় এবং এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অশুল্ক বাধা ধীরে ধীরে অপসারণের সুপারিশ করা হয়।

আরও